পুলিশ ও সাংবাদিক পরিচয়ে নারীর মাদক ব্যবসা!

কখনো পুলিশ, কখনো সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে যশোর শহরে মোটরসাইকেলে দাপিয়ে বেড়ানো সেই আলোচিত নারী রেহেনা ওরফে লিপিকে (২৫) আটক করেছে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। প্রতারণা ও মাদক বিক্রির অভিযোগে বুধবার বিকেলে ৪ সহযোগীসহ তাকে আটক করা হয়। রেহেনা ওরফে লিপি চৌগাছার মাশিলা নারায়নপুর গ্রামের মিঠুর স্ত্রী ও মো. হানিফের মেয়ে। এখন শহরের রেলগেট এলাকায় তার বসবাস।

এসময় সোহেল, বাবু, পিয়া ও ওহিদুল নামে তার চার সহযোগীও আটক হয়েছে। তাদের কাছ থেকে দুটি ওয়াকিটকি, নকল কয়েকটি পরিচয়পত্র ও নানা প্রতারণা সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে।

এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত থানা হাজতে তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ চলছিলো। তাদের কাছ থেকে প্রতারণা ও অপরাধ সংঘটিত করার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়াও চলছিলো।

পুলিশ জানিয়েছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে কখনও সাংবাদিক, কখনও সিআইডি, কখনোবা ডিবি পুলিশ সেজে ভয়ানক সব অপতৎপরতা ও প্রতারণায় লিপ্ত ছিলেন লিপি। পুলিশ ও সাংবাদিকসহ যশোরের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকে বোকা বানিয়ে বিকট আওয়াজে মোটরসাইকেলে রাস্তায় চলছিলেন তিনি। কাকডাকা ভোরে কিংবা রাত বারোটার পরেও তাকে দেখা যাচ্ছিল যশোর শহরে দাপিয়ে বেড়াতে। অত্যাধুনিক বেশে ভোলপাল্টে অপকর্ম চালিয়ে যাওয়া এই লিপির বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে তথ্য আসলে আটক অভিযানে নামে একটি টিম।

ছবি সংগৃহীত

যশোর কোতোয়ালি থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) সমীর কুমার সরকারের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করেন সেকেন্ড অফিসার আমিরুজ্জামান। ১৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় যশোর জিলা স্কুল এলাকা থেকে আটক হন লিপি। তিনি চৌগাছা উপজেলার যাত্রাপুর মাশিলা গ্রামের মেয়ে। এসময় আরো আটক হয় শংকরপুরের মুরগি খামার এলাকার লিটন হোসেনের ছেলে সোহেল, রেল স্টেশন বিসমিল্লাহ সেলুনের পেছনের টুকু মিয়ার ছেলে বাবু, রায়পাড়ার বাবলুর মেয়ে প্রিয়া ও আশ্রম রোডের সুরুজ আলীর ছেলে ওহিদুল। এরা লিপির সকল অপকর্মের সহযোগী ও সাথী।

 

কোতোয়ালি থানার সেকেন্ড অফিসার আমিরুজ্জামান জানিয়েছেন, চার বছর আগে লিপি নাটকীয়ভাবে যশোর শহরে আস্তানা গাড়েন। হত দরিদ্র পরিবারের এই মেয়ে লোভে পড়ে বহু পুরুষ ও ইয়াবায় আসক্ত হন। পরে চৌগাছা উপজেলার নারায়নপুর গ্রামের হেলাল মিয়ার ছেলে কোটচাঁদপুর পৌরসভার সচিব আবুল ফজল এনামুল হক মিঠুর পাল্লায় পড়ে অনৈতিক কর্মকান্ডে নাম লেখান।

অভিযোগ রয়েছে, যশোর শহর ও শহরতলীর আরও কয়েকজন বিতর্কিত নারীকে নিয়ে চলে তার ইয়াবা কারবার। এতে বিশাল লাভ হওয়ায় কখনও প্রাইভেট কারে, কখনও মোটরসাইকেলে চলাফেরা শুরু করেন। শূন্য হাতে যশোরে আসা ‘নুন আনতে পান্তা ফুরানো’ হত দরিদ্র পরিবারের মেয়ে লিপি এখন মাসে মাসে মোটরসাইকেলের মডেল পাল্টান বলেও তথ্য পায় পুলিশ। আলীশান বাড়িতে ভাড়া থাকায় তাকে নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে থাকে। তিনি নিজেকে কোটচাঁদপুর পৌরসভার সচিব আবুল ফজল এনামুল হক মিঠুর স্ত্রী পরিচয় দিয়ে চলতে শুরু করেন। লিপির এসব কর্মকান্ডে তুমুল হৈচৈ শুরু হয় যশোরে। লিপির অবস্থান করা ও গোপন ব্যবসার কয়েকটি ডেরার দিকে নজরদারি শুরু করে পুলিশের কয়েকটি সিভিল টিম।

মিঠু ছাড়াও আরও কয়েকজনকে তিনি স্বামী পরিচয় দিয়ে চলেন। চট্টগ্রামের একটি ইয়াবা সিন্ডিকেটের সাথে সখ্য রেখে চলা এই লিপির আসল রূপ বেরিয়ে পড়লে তিনি বাসা পাল্টিয়ে সটকে পড়েন।

এসব ঘটনায় গত বছরের ২৬ নভেম্বর রাতে যশোর শহরের খালদার রোডের একটি বাসা থেকে ইয়াবা সেবন সামগ্রীসহ আটক হন তিনি। এরপরও তার টনক নড়েনা। লিপি যশোর উপশহর বি ব্লক এলাকার খাদিজা খাতুন ও শহরের রেলগেট এলাকার প্রিয়াকে ব্যবহার করে কখনও ছেলে সাজিয়ে, কখনও খেলোয়াড় সাজিয়ে অপকর্ম চালিয়েছেন বিভিন্ন সময়।

পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে, ইয়াবা কারবার ও অনৈতিক কর্মকান্ড বহাল রাখতে তিনি কখনো সাংবাদিক, কখনও সিআইডি পুলিশ, রেল পুলিশ সেজে চলছিলেন। উচ্চ শব্দে মোটরসাইকেল চালিয়ে যশোরের দড়াটানা পার হওয়ার সময় তার দুটি মোটরসাইকেল আটক করে ট্রাফিক পুলিশ। ইয়াবাসেবী ও বহু পুরুষে আসক্ত লিপি শহরের অনেকের কাছে প্রিয়পাত্রী, যশোর ডিসি পার্কের কোনায় কাক ডাকা ভোরে যার অবস্থান। তিনি মাদক কারবারী হলেও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, তিনি বিশাল সাংবাদিক!

এ ব্যাপারে থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) সমীর কুমার সরকার জানিয়েছেন, ভয়ানক প্রতারণার সাথে জড়িত এই লিপি চক্র। ওয়াকিটকিসহ আটক হওয়ার পর তারা নিজেদের রেল পুলিশ পরিচয় দিয়ে ভুয়া পরিচয়পত্র দেখায়। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়েতে যোগাযোগ করা হলে তাদের পরিচয় ভুয়া প্রমাণিত হয়। বিটিসিএল-এর অনুমোদন ছাড়াই ওয়াকিটকি ব্যবহার করার বিধি না থাকলেও লিপি চক্রের কাছে দুটি ওয়াকিটকি পাওয়া গেছে। যা সংগ্রহ ও সরবরাহ লিপিই করেছেন। এছাড়া ভারতীয় একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পোষাক পরিহিত পরিচয়পত্রও তাদের কাছে পাওয়া গেছে।

তিনি আরো জানান, এই লিপি ও তার সহযোগীরা যশোর শহরে বহু বিতর্কিত। আটকের পর তাদের বিরুদ্ধে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। প্রতারণাসহ আরও বড় ধরণের অপরাধে জড়িত বলে আসছে ভয়ানক সব তথ্য। আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুতি চলছে।