বেনাপোল-পেট্রাপোল দিয়ে আমদানি-রফতানির কী হবে !

ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের বাধার মুখে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে গত ২৫ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমদানি-রফতানি বন্ধ ছিল। বিএসএফ বাধা তুলে নিলে ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ফের দুই দেশের মধ্যে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল শুরু হয়। আমদানি-রফতানি চালুর সময় বিএসএফ জানায়, আগের মতোই শুধু কাস্টমস পারমিট পাস নিয়ে আগামী ২০ মার্চ পর্যন্ত সিঅ্যান্ডএফ কর্মচারীরা ব্যবসায়িক কাজে পেট্রাপোল বন্দরে প্রবেশ করতে পারবেন। কিন্তু ওই তারিখের পর কী হবে, বিষয়টি সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের কেউই অবগত নন।

উল্লেখ্য, দেশের আর কোনও স্থলবন্দরে এখনও পর্যন্ত এধরনের কোনও বাধার খবর পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন:হাসপাতালে লাশের ছড়াছড়ি, আসল চিত্র লুকাচ্ছে ইরান

বেনাপোলের স্থানীয় আমদানি-রফতানিকারকরা জানিয়েছেন, এই অঞ্চলের কিছু সিঅ্যান্ডএফ কর্মচারী আছেন, যারা কাস্টমসের পাস নিয়ে ভারতের কাস্টমসে কাগজপত্র জমা দিতে যান, তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, কাস্টমসের কাগজপত্রের আড়ালে তারা বিভিন্ন অনৈতিক কাজ করে থাকেন। সেকারণেই বিএসএফ তাদের প্রবেশাধিকারে বাধা দেয়।

আমদানি-রফতানির সঙ্গে সম্পৃক্ত বেনাপোলের ব্যবসায়ী আমিনুল হক জানান, ‘ভারত থেকে পণ্য আমদানির কাগজপত্র এদেশে পৌঁছানো এবং এখানকার কাগজপত্র সেখানে দিয়ে আসার জন্যে কিছু কর্মী কাজ করেন। এই কাগজপত্র দ্রুত পৌঁছালে পণ্য খালাসও দ্রুত হয়। কাগজপত্র লেনদেনের কারণে উভয় দেশের লোকজনের যাতায়াত করতে হয়।  কিন্তু কেউ কেউ সেদেশের কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেছেন, এই আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে এদেশের কিছু লোক কাস্টমসের পারমিটের কপি নকল করে সোনা, মাদক, ডলার ইত্যাদি চোরাচালান করছে। তাই নিরাপত্তার কথা বলে বিএসএফ এদেশের লোকজনকে ভারতে প্রবেশে বাধা দেয়।’

অপর ব্যবসায়ী জামালউদ্দিন বলেন, ‘কাগজপত্র ঠিক করতে যাওয়া কর্মীদের এভাবে বাধা দেওয়া হলে পণ্য আমদানি-রফতানিতে অচলাবস্থা তৈরি হবে। যার ফলে দেশে এখন যেখানে প্রতিদিন চার-পাঁচশ’ পণ্যবাহী ট্রাক ঢোকে, সেখানে ৪০-৫০টির বেশি ঢুকতে পারবে না।

আগামী ২০ মার্চ নতুন কী পদ্ধতি চালু হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত আমরা এটি শুনিনি। তবে যে ব্যবস্থাই নেওয়া হোক না কেন- তা দুই দেশের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে হবে।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুর রহমান বলেন, ‘বেনাপোল থেকে আমরা পেট্রাপোলে খুব সহজেই যেতে পারি। সেখানে গিয়ে তাদের অফিশিয়াল কাগজপত্র আমরা তৈরি করে দিয়ে আসি। এতে করে পণ্য বন্দরে ঢুকতে সহজ হয়। ফলে প্রতিদিন প্রায় তিন থেকে চারশ’ পণ্যবাহী ট্রাক বেনাপোলে আসতে পারে। আমরা যদি সেখানে না যেতে পারি, তাহলে কাজের গতি কমে যাবে। তখন দিনে ৫০ থেকে ৬০টি ট্রাক ঢুকতে পারবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি শুনেছি, ভারতের একজন ডেপুটি হাইকমিশনার নাকি সেখানকার সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে জানিয়েছেন- সিঅ্যান্ডএফের স্টাফদের পেট্রাপোলে ইজি এন্ট্রান্স তাদের জন্যে ঝুঁকির। সেকারণে বিএসএফ আমাদের প্রবেশে বাধা দেয়। অবশ্য ২০ মার্চ পর্যন্ত আমরা আগের মতোই কাজ করতে পারবো। পরে কী হবে জানি না।

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইমদাদুল হক লতা বলেন, ‘আমরা আগের মতোই কাজ করছি। শুনেছি ২০ মার্চের পরে নতুন নিয়ম করা হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত সেটি আমরা জানতে না পারি, ততক্ষণ আসলে বোঝা যাচ্ছে না- সেটি খারাপ হবে নাকি ভালো হবে। তবে আশা করছি, এ অবস্থা থেকে উত্তরণে দুই দেশের প্রতিনিধিরা বসে আলোচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে পারবো। যেহেতু এটি আন্তর্জাতিক বিষয়, আমার মনে হয় না কোনও নেতিবাচক সিদ্ধান্ত তারা নেবে।’

ভারত-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক মতিয়ার রহমান বলেন, ‘শিগগিরই কাস্টমস ও বন্দর ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বসবেন। উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কর্মকর্তারা বৈঠক করলেই এর সুষ্ঠু সমাধান সম্ভব। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে আমি কাস্টমস কমিশনারের সঙ্গে কথা বলেছি।’

বেনাপোল স্থলবন্দরের উপপরিচালক আব্দুল জলিল বলেন, ‘সিঅ্যান্ডএফ স্টাফদের পাসপোর্ট জটিলতার কারণে বিএসএফ দুই দিন তাদের বাধা দেয়। পরে অবশ্য সেটি স্বাভাবিক হয়েছে। ২০  মার্চের পরে কী হবে- এখনও আমাদের আনুষ্ঠানিভাবে জানানো হয়নি। যদি নতুন কোনও পদ্ধতি হয়, তাহলে উভয় দেশের কর্তৃপক্ষের আলোচনার ভিত্তিতেই তা সমাধান করা সম্ভব।’

এসব বিষয়ে কথা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ৪৯ ব্যাটালিয়নের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল সেলিম রেজার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমদানি-রফতানির বিষয়টি মূলত কাস্টমসের ব্যাপার এবং প্রক্রিয়াগত কারণে সিঅ্যান্ডএফ এর সঙ্গে জড়িত। উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে স্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা আমাদের বিষয়টি অবগত করেছেন। ২০ মার্চের বিষয়টি আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে শুনেছি। কিন্তু বিএসএফের পক্ষে অফিশিয়ালি আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। তবে সীমান্তে ল্যান্ড পোর্টের ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারি যেকোনও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সহযোগিতা করতে আমরা প্রস্তুত আছি।’

দেশদর্পণ/আহা/বাটি/ম